জেরুজালেম বিমানবন্দর 'ইহুদীকরণ': ফিলিস্তিনের ইতিহাস মুছে দেওয়ার নতুন ষড়যন্ত্র
১৯২০ সালে নির্মিত ঐতিহাসিক জেরুজালেম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে 'ইহুদি হেরিটেজ সেন্টার'-এ পরিণত করার পরিকল্পনা করছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনিরা বলছেন — এটা কেবল একটি ভবন দখল নয়, এটা একটি জাতির স্মৃতি মুছে দেওয়ার চেষ্টা।
'ইহুদীকরণ' পরিকল্পনা ইসরায়েলের
ফিলিস্তিনের মাটি, ঘরবাড়ি, মসজিদ — একে একে সব কিছু কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এবার পালা ইতিহাসের। অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের কালান্দিয়ায় অবস্থিত ঐতিহাসিক জেরুজালেম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে 'ইহুদি হেরিটেজ সেন্টার'-এ রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে ইসরায়েল। এই পরিকল্পনা শুধু একটি পুরনো ভবনের ভাগ্য পরিবর্তনের বিষয় নয় — এটি ফিলিস্তিনি জাতির সার্বভৌমত্বের শেষ প্রতীকগুলোর একটিকে মুছে দেওয়ার সুচিন্তিত পদক্ষেপ।
- পরিকল্পনাকারী: ইসরায়েলি হেরিটেজ মন্ত্রী রাব্বি আমিচাই এলিয়াহু
- বরাদ্দ: ৩০ লাখ শেকেল (প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার)
- বাজেট: ২০২৬ সালের হেরিটেজ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত বাজেট থেকে
- স্থান: কালান্দিয়া, উত্তর পূর্ব জেরুজালেম (রামাল্লাহ সীমান্ত সংলগ্ন)
- উপলক্ষ: অপারেশন এন্টেবির ৫০তম বার্ষিকী
- প্রতিবাদ: জেরুজালেম গভর্নরেট, ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ, জাতিসংঘ
✈️ বিমানবন্দরটির ইতিহাস: এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
জেরুজালেম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর — যা আটারোট বিমানবন্দর নামেও পরিচিত — এর ইতিহাস শুধু একটি বিমানবন্দরের ইতিহাস নয়, এটি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার স্বপ্নের ইতিহাস।
ফিলিস্তিনিদের কাছে এই বিমানবন্দরটি শুধু একটি স্থাপনা নয় — এটি তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের সম্ভাব্য সার্বভৌমত্বের প্রতীক। যেকোনো শান্তি আলোচনায় এই বিমানবন্দরকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
🏛️ কী বানাতে চাইছে ইসরায়েল?
ইসরায়েলি হেরিটেজ মন্ত্রী রাব্বি আমিচাই এলিয়াহুর প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলে নির্মিত ও জর্ডানি শাসনে সম্প্রসারিত বিমানবন্দরের ঐতিহাসিক রিসেপশন ভবনটিকে একটি 'হেরিটেজ, পর্যটন ও শিক্ষাকেন্দ্র'-এ পরিণত করা হবে।
"প্রস্তাবিত এই কেন্দ্রটি জেরুজালেম সম্পর্কে ইসরায়েলি বর্ণনাকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছে।"
— জেরুজালেম গভর্নরেটের সতর্কতামূলক বিবৃতিঅর্থাৎ এই 'হেরিটেজ সেন্টার' আসলে ইতিহাস সংরক্ষণের জায়গা নয় — এটি ইসরায়েলি দৃষ্টিকোণ থেকে জেরুজালেমের ইতিহাস নতুন করে লেখার একটি প্রকল্প, যেখানে ফিলিস্তিনের অস্তিত্বকে মুছে ফেলা হবে।
⚠️ এর আগেও ছিল বড় পরিকল্পনা
এই হেরিটেজ সেন্টার পরিকল্পনা হঠাৎ করে আসেনি। এর আগে ইসরায়েলি সরকার একই বিমানবন্দর এলাকায় প্রায় ৯ হাজার আবাসিক ইউনিটের একটি বিশাল অবৈধ বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিল।
🌍 আন্তর্জাতিক আইন কী বলছে?
জাতিসংঘ পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমকে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এখানে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন সম্পূর্ণ অবৈধ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) ঐতিহাসিক রায়ে ঘোষণা করে — ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারিত্ব অবৈধ এবং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের সকল বসতি থেকে ইসরায়েলকে সরে যেতে হবে।
তবু ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়েই চলেছে। এই হেরিটেজ সেন্টার পরিকল্পনা তারই সর্বশেষ উদাহরণ।
😠 ফিলিস্তিনিদের প্রতিক্রিয়া
জেরুজালেম গভর্নরেট এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে। তারা বলছে — ইসরায়েল এখন আর "ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ" নীতি থেকে সরে এসে জেরুজালেমকে তার ফিলিস্তিনি পরিবেশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পথে হাঁটছে।
ফিলিস্তিনিরা দীর্ঘ দশকগুলো ধরে বলে আসছেন — ইসরায়েল বসতি স্থাপন ও উচ্ছেদ নীতির মাধ্যমে পূর্ব জেরুজালেমের আরব ও ইসলামিক পরিচয় ধ্বংস করতে চাইছে, যা শান্তি ও দুই-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে একেবারে শেষ করে দিচ্ছে।
📌 উপসংহার: ইতিহাস মুছলেই কি সত্য মুছে যায়?
একটি ভবন দখল করা যায়, নাম পাল্টানো যায়, নতুন সাইনবোর্ড লাগানো যায় — কিন্তু ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। ১৯২০ সালে যে মাটিতে ফিলিস্তিনের প্রথম বিমানবন্দর নির্মিত হয়েছিল, সেই মাটি তার স্মৃতি বুকে ধরে রাখবে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল প্রতিদিন ফিলিস্তিনের একটু একটু করে ইতিহাস মুছে দিচ্ছে। এই বিমানবন্দর পরিকল্পনা সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ারই নতুন অধ্যায়। বিশ্ব বিবেক কি আর কতদিন নীরব থাকবে?
